জীবাণুর ঔষধ প্রতিরোধ (Drug Resistance): বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক

গত ২৯ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে “Antimicrobial Resistance: From Awareness to Action” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পালিত হল বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস ২০১৭। শুধুমাত্র প্রাণিসম্পদ নয়, সমগ্র মানব গোষ্ঠির স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করলে, প্রতিপাদ্যটি সময়ের একটি চরম দাবি। সরকারি অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকল স্বায়ত্ত্বশাসিত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, উদ্যোক্তাসহ সকলেরই উচিত এর যথাযথ বাস্তবায়নে সচেতন ভূমিকা রাখা ।

রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোকে (যেমন-ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, ছত্রাক) একত্রে অণুজীব (Microorganism) বলা হয়। অপরদিকে, জীবাণু সংঘটিত রোগসহ জীবাণু ধ্বংসকারী পদার্থের নাম এন্টিমাইক্রোবিয়াল। যখন রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু এ ধরনের কোন পদার্থের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে তখন তাকে Antibiotic resistance (এন্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে), Antimicrobial resistance (যে কোন অণুজীব জীবাণুধ্বংসকারী ঔষধের ক্ষেত্রে) এবং Drug Resistance (যে কোন ঔষধের ক্ষেত্রে) বলা হয়। তবে, কার্যত: Bacteria-এর সংক্রমণ, প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য Antibiotic তুলনামূলকভাবে বৃহত্তর পরিসরে ব্যবহৃত হওয়ায় Antibiotic resistance বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, HIV, ইনফ্লুয়েঞ্জার জীবাণু এ ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে অধিক পটু। এ ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জীবাণু এখন মানুষ, প্রাণী ও খাদ্যদ্রব্যসহ পরিবেশের প্রায় সবখানেই বিরাজমান। দুর্বল জৈবনিরাপত্তা (Biosecurity), অপর্যাপ্ত পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তা দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে এবং প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিবছর কমপক্ষে ৭ লাখ মানুষ মারা যায় শুধুমাত্র এ ধরনের ঔষধ প্রতিরোধের (Drug Resistance) কারণে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে বছরে ১ কোটিতে যার সামগ্রিক প্রভাব প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রতিনিয়তই জীবাণুর এধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নতুন নতুন উপায়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে, সংক্রামক রোগের চিকিৎসা হুমকির মুখে পড়ছে, অসুস্থতার মেয়াদ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা অক্ষমতা এমনকি মৃত্যু ডেকে নিয়ে আসছে। কার্যকর ঔষধ ছাড়া সংক্রামক রোগের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন- অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ক্যানসার কেমোথেরাপি, ডায়াবেটিক ব্যবস্থাপনা, C-সেকশন বা Hip প্রতিস্থাপন এর মত বড় ধরনের সার্জারি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDG) অর্জনে একটি অন্যতম অন্তরায় ছিল এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে আশংকা ।

যদিও Drug বা Antibiotic resistance একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু, মানুষের অজ্ঞতা, অসচেতনতা বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবহেলা পরিস্থিতিকে চরম বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর এমনটিই হচ্ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও। এন্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ঔষধের অপব্যবহার বা মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকগণ। যেমন, আক্রান্ত হবার পূর্বেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে, ভাইরাস আক্রান্ত ঠাণ্ডা বা ফ্লুতে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে ‘বৃদ্ধি বর্ধক’ (Growth Promoter) হিসেবে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ। প্রানিজ আমিষ বা কৃষিপণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঔষধ প্রয়োগের পর নির্দিষ্ট মেয়াদের (Withdrawal Period) পূর্বেই সংগ্রহ এবং বাজারজাত করা। বিশেষ করে, প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রে ঔষধের ব্যবহার অনেকখানি বেপরোয়া এবং তা বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের কোন সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ ভাগ এন্টিবায়োটিকই ব্যবহৃত হয় প্রাণীর ক্ষেত্রে। প্রান্তিকভাবে, এ সবগুলিই বিভিন্ন মাধ্যমে চলে যায় মানবদেহে। এছাড়াও, প্রাথমিকভাবে আমাদের দেহে খুব কম পরিমাণ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জীবাণু থাকে। কিন্তু, আমরা যখন এন্টিবায়োটিক বা অন্য ঔষধ গ্রহণ করি তখন তা শুধুমাত্র সংবেদনশীল জীবাণু ধ্বংস করে যা প্রকারান্তে প্রতিরোধী জীবাণুর পর্যাপ্ত খাবার এবং জায়গার ব্যবস্থা করে ফলে তা বহুগুণে বেড়ে যায়।

ঔষধের মাত্রা (dose) নিয়মতান্ত্রিকভাবে মেনে না চলাও আমাদের দেশে একটি অন্যতম সমস্যা। একদিকে, কম মাত্রায় গ্রহণ করলে জীবাণু ধ্বংস না হয়ে তা জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উস্কে দেবে। অন্যদিকে, অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে তা দেহে বিষক্রিয়া ছড়াবে এবং পরবর্তী চিকিৎসায় ক্রমবর্ধমানভাবে ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে যা দেহের জন্য ক্ষতিকারক। এছাড়াও, অসুস্থতার লক্ষণ একটু কমার সাথে সাথেই ঔষধ খাওয়া বন্ধ করা একটা সাধারণ সমস্যা যা অর্ধমৃত জীবাণুকে সময়ের ব্যবধানে সক্রিয় করে তোলে এবং তা প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে। এজন্য, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক যেকোনো ঔষধ পূর্ণ মেয়াদে গ্রহণ করা আবশ্যক। ব্যাকটেরিয়াসহ অন্যান্য জীবাণু নানাপ্রক্রিয়ায় প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এটি হতে পারে cell wall-এর গাঠনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে, enzyme নিঃসরণের মাধ্যমে, ঔষধের কোষে প্রবেশকে বাধাগ্রস্থ করে বা বহিঃনির্গমনকে ত্বরাণ্বিত করে, টার্গেট স্থানের পরিবর্তনের মাধ্যমে, মিউটেশনের মাধ্যমে Genetic Materials রূপান্তরসহ আরও নানা পন্থায়।

অতি সংকটপূর্ণ এই সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীগণ মতামত দিয়েছেন, এন্টিবায়োটিকসহ সবধরণের ঔষধের ব্যবহার যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এজন্য সর্বস্তরে সচেতনতা অত্যাবশ্যক। যাতে করে যে কোন রোগী বা প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে খামারীগণ যথেচ্ছভাবে এন্টিবায়োটিক না চান, ক্লিনিশিয়ানসহ ভেটেরিনারিয়ানগণ সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনছাড়া ঔষধ গ্রহণের নির্দেশ না দেন। স্বাস্থ্যবিধি উন্নত করা যেন জীবাণুর বিস্তার ও আক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ফলে, রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসবে, ঔষধ ব্যবহার কমবে এবং ঔষধ প্রতিরোধীও ত্বরিত নিম্নগামী হবে। এজন্য নিবিড় তত্ত্বাবধায়ন ও নিখুঁত প্রতিবেদনকে ভিত্তিকরে ঔষধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণমূলক কঠোর নীতিমালা সময়ের দাবী। এলক্ষ্যে, জুলাই ২০১৪ সালে তৎকালীন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি কমিশন গঠন করা হয় যা ২০১৬ সালে একটি বিশদ প্রতিবেদন দাখিল করে যেখানে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এই সমস্যা বিদ্যমান থাকায় বাংলাদেশেরও উক্ত কমিশনে যোগ দেয়া উচিৎ বলে আমরা মনে করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রতিটি রাষ্ট্রে জীবাণুর ঔষধ প্রতিরোধ কমানোর উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি উন্নত করার জন্যে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। এছাড়াও, মানুষ ও প্রাণীর ক্ষেত্রে, এন্টিবায়োটিকের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব প্রানিস্বাস্থ্য সংস্থার (OIE) সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে এ সংস্থাটি। কার্যকর এবং নিরাপদ ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রামক রোগের সফল চিকিৎসা ও প্রতিরোধ যথাসম্ভব নিশ্চিত করার করতে ১৮-২৬ মে ২০১৫ তারিখে ৬৮তম World Health Assembly-তে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক “Global Action Plan on Antimicrobial Resistance” গৃহীত হয়। বিষয়টিকে ত্বরান্বিত করতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সংরক্ষণের স্বার্থে সদস্যরাষ্ট্র, বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজ, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও একাডেমিশিয়ানদের সমন্বয়ে ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউ ইয়র্কে।

দ্রুত, কম খরচে এবং নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় করে গড়পড়তা ঔষধের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট ঔষধের সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে টীকা প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এটি রোগের প্রাদুর্ভাব কমিয়ে দেবে। ফলে চিকিৎসাব্যয়সহ অন্যান্য ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে এবং ঔষধ প্রতিরোধের কোন সুযোগ তো থাকছেই না। দেখা যায় যে, নতুন আক্রমণের ক্ষেত্রে (হোক তা নতুন কোন জীবাণু বা মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত জীবাণু) ক্লিনিশিয়ান বা ভেটেরিনারিয়ানগণ প্রচলিত ঔষধ অধিক মাত্রায় প্রয়োগ করে সমাধানের পথ খোঁজেন যা নাজুক পরিস্থিতিকে কঠিনতর করে ফেলছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যে হারে নতুন নতুন জীবাণু বা রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে ফলপ্রসূ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্বতন্ত্র ঔষধ সে হারে আবিষ্কৃত হচ্ছে না। উন্নত মানের ঔষধ ও টীকা আবিষ্কার করে পরিস্থিতি সামাল দিতে গবেষণা প্রক্রিয়া বিস্তৃত করা আশু প্রয়োজন আর এজন্য বিশ্বের যথাসম্ভব সব জাতিকে নিয়ে Global Innovation Fund গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বিশ্লেষকগণ।

জীবাণুর এন্টিবায়োটিকসহ যে কোন ঔষধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন বিশ্বব্যাপী একটি জটিল সমস্যা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঔষধের যথার্থ প্রয়োগ, গবেষণার মাধ্যমে কার্যকরী ঔষধ আবিষ্কারসহ চৌকস কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে এটির নিয়ন্ত্রণ অবশ্যকরণীয়।।

 

লেখক-

পিএইচডি গবেষক, মনোবুশো স্কলারশিপ, Tokyo University of Agriculture and Technology, টোকিও, জাপান।

বিসিএস (প্রাণিসম্পদ), ভেটেরিনারি সার্জন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

2 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *